বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। অতীত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে পরাজিত কিংবা ক্ষমতাচ্যুত হবার পর হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়গুলো সামনে আসে।
আর প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দেশের ভেতর এবং প্রতিবেশী ভারত এ বিষয়ে উদ্বেগ দেখায়। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হিন্দু সম্প্রাদায় নির্যাতনের বহু ঘটনার খবর সংবাদ মাধ্যমে আসলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া ভারত বা দেশের ভেতরে দেখা যায় না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, রামুতে একযোগে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা ও সুনামগঞ্জ জেলার সাল্লায় উপজেলার হবিপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলার মতো বড় ঘটনা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ঘটেছে। এ ছাড়া বরগুনার তালতলীতে যুবলীগের নেতার বিরুদ্ধে ১৪টি হিন্দু পরিবারকে উচ্ছেদের অভিযোগ রয়েছে।
আর গোপালগঞ্জে দেশের আলোচিত ব্যক্তি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের হিন্দুদের ‘শত শত বিঘা’ জমি দখলের ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটলেও এ বিষয়ে হিন্দু সম্প্রদায় বা ভারতের কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ অভিযোগ উত্থাপন করলেও তৎকালীন সরকার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। নিশ্চুপ ছিল দেশের হিন্দু সম্প্রদায় এবং ভারত। এছাড়া মোহাম্মদপুরে ঢাকা-১৩ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সাদেক খান ও রাজশাহী-৩ (মোহনপুর-পবা) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনের বিরুদ্ধে হিন্দুদের অসংখ্য সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারতীয় সংবাদ মাধম্যের অতিরঞ্জিত খবর প্রচারের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বাংলাদেশের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দল এমনকি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলছেন। সেইসঙ্গে দুইদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য এমনকি অস্তিত্ব নিয়েও কটাক্ষ করা হচ্ছে। সবশেষ এই কাতারে যোগ দিয়েছেন, কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম।
শুক্রবার (৮ নভেম্বর) কলকাতায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মেয়র বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যেটা হচ্ছে সেটা ঠিক হচ্ছে না। ভারতের সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনোদিন আসতো না। সে সময় বাংলাদেশকে সমর্থন, শেখ মুজিবুর রহমানকে রেখে দেয়া বা বাংলাদেশকে প্রথম সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া সবটাই ভারত করেছিল। ভারতের মাটিতে তাদের কয়েক কোটি শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল। তাই ভারতকে এড়িয়ে বাংলাদেশ থাকতে পারবে না, বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারবে না।’
বিগত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে অসংখ্য সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার পরেও দেশের ভেতর ও ভারতের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও তিন মাসে এতো হৈচৈ পড়ে যাওয়ায় এটা নিছক একটি ট্রাম্পকার্ড হিসেবেই অনেকে মনে করেন। বাংলাদেশে যখন যে সরকারই ক্ষময়তায় ছিল প্রতেবেশী বন্ধুত্বসূলভ সম্পর্ক রেখে ভারতের সাথে বাণিজ্যকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছে।
তবে গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ ভারতকে ট্রানজিট, নদী বন্দর এবং একচেটিয়া বাণিজ্যের সুবিধা দিয়েছে তা কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আওয়াত ছিল না, বরং এটি এটি রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের কাছে সপে দেয়ার মতো। আর সে কারণেই স্বয়ং শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, ভারতকে যা দিয়েছি সারা জীবন মনে রাখবে। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশকে বিনাশর্তে ব্যবহারের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের জন্য আর্শিবাদ হয়ে উঠেছিল। আর তাই সংখ্যালঘু ট্রাম্পকার্ড খেলে হলেও ভারত মনে করে নিজেদের স্বার্থে শেখ হাসিনা সরকার বার বার দরকার।